আমি বদ্ধ পাগল

আমি বদ্ধ পাগল

  আমি বদ্ধ পাগল

Kazi Abdul Halim Sunny

,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

স্যারের লম্বা চওড়া প্রশ্নের বেশ সংক্ষিপ্ত জবাবই দিচ্ছে ছেলেটা।

স্যারঃ”নাম কিরে তোর?”

“সানু”

স্যারঃ”শুধুই কি সানু?আগে পাছে কিছু নাই আর?”

“জ্বি না, স্যার।”

স্যারঃ” কি বলিস রে,,তা কি করে হয়?”

“স্যার,আমি হিমু নয় যে আমার ভালো নাম হবে হিমালয়। আমি সানু।আমার ভালো নাম,খারাপ নাম দুইটাই সানু।”

স্যারঃ”তুইতো দেখছি কিছুটা পাগলাটে।”

“কিছুটা না স্যার পুরোটাই পাগল কিসিমের।আমি বদ্ধ পাগল।”

স্যারঃ”যে পাগল সে তো কখনোই বুঝে না যে, সে পাগল।তার মানে তুই পাগল না।”

“আপনার যুক্তি বেশ ভালোই। তবে তা কেবল প্রাথমিক পাগলদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমার মতো যারা বদ্ধ পাগল তাদের ক্ষেত্রে না।”

আমার জানার প্রবল ইচ্ছা ছিল যে সে কোথা থেকে এসেছে পরে দেখি স্যার প্রশ্নটা করেই ফেললেন।

স্যারঃ “এই বদ্ধ পাগল কোথা থেকে এসেছে?”

“সুনামগঞ্জ “

স্যারঃ “শুধুই কি সুনামগঞ্জ? স্ফ্যাসিফিক কোনো এড্রেস নাই?”

“না, স্যার।সুনামগঞ্জের পুরোটাই আমার কাছে সুনামগঞ্জ। নো স্ফ্যাসিফিক এড্রেস।”

স্যারঃ”তা এই কলেজে পড়তে চাস কেনো? ভালো রেজাল্ট করার জন্যে নাকি?”

“না,স্যার।বাবা বললেন পড়ার জন্যে তাই পড়তে চাই।ভালো রেজাল্ট কিংবা খারাপ রেজাল্ট কোনোটা করার পিছনেই আমার আদৌ কোনো ইন্টারেস্ট নাই।”

স্যারঃ “তাহলে তো এই কলেজ তোর জন্যে না। যারা মন থেকেই ভালো করে পড়ে তাদের জন্যে এই কলেজ।তোর অন্য কলেজ দেখা দরকার।মন খারাপ করিস না।।”

“না স্যার। আমি কখনোই মন খারাপ করি না। এটি আমার গুড সাইট মা বলতেন।আসি স্যার আসসালামু আলাইকুম। “

এই বলে চলে গেল সানু।আর আমার কিছুই ভালো লাগছে না।কি অন্যরকমই করেই না কথা বলছিলো সানু।ভালো লেগে গিয়েছিল ছেলেটাকে।ইস, ও যদি পড়তো আমাদের সাথে!স্যার ও দেখলাম আমার মনোভাসনাকে সত্য করে দিয়ে ডাকলেন তাকে।

স্যারঃ”কিরে যাস নি তুই?”

“না,স্যার।”

স্যারঃ “কিন্তু কেনোরে?”

“আমার মনে হয়েছিলো যে আপনি আমায় ডাকবেন তাই”

স্যারঃ “কেনো মনে হয়েছিলো তোর?”

“আমার সাথে কথা বলে আপনার খুব ভালো লেগেছিলো তাই।”

স্যারঃ “আমি কি তকে বলেছি তা?”

“না, স্যার।তবে আমার অনুমান শক্তি বেশ ভালোই।”

স্যারঃ “তা কি তোর অনুমান শক্তি দিয়েই বুঝতে পারলি যে তোর সাথে কথা বলে আমার ভালো লেগেছে?”

“না, স্যার। শুধু অনুমান না।”

স্যারঃ “তাহলে?”

“বদ্ধ পাগল মানুষের সাথে কথা বলে মজা পাওয়া যায়।”

স্যার হো হো করে হাসছেন।আমার খুব বিরক্তি লাগছে স্যারের প্রতি। এত চমৎকার করে কথা বলছে সানু আর স্যার হাসছেন!আর অপেক্ষা করতে লাগলাম সানুর মুখে আরো কিছু শোনার জন্যে।কিন্তু বেচারা তো হাসতে হাসতে শেষ।নিজের কোনো কথায় কেউ যে এত হাসতে পারে তা আমি সানুকে না দেখলে বুঝতাম না।এবার বুঝলাম কেনো যে সে নিজেকে বদ্ধ পাগল বলে দাবি করে।হাসতে হাসতে প্রথম পিড়িয়ড কে ইস্তফা দিয়ে দিলো সে।ঘন্টা পড়লো। স্যারও চলে গেলেন।

সানুর ভর্তি দফা শেষ হলো।একটু পাগল কিসিমের বলেই হয়তো কেউ আগবাড়িয়ে এসে কথাটথা বলল না।তবে আমি বসে থাকলাম না।

“কেমন আছ,সানু?”

সানুঃ”ভালোই, কম খারাপ না!”

বলে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে।প্রথমদিকে আমিও কিছুক্ষন তাকে সঙ্গ দিলাম। কিন্তু কেউ যদি এক-দু মিনিটের জায়গায় এক ঘন্টা হাসে তো তাকে সঙ্গ দিবে কে?

সানুঃ”দুঃখিত, আমার একটা চরম বাজে রোগ আছে।তা হলো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা হাসা।”

রাগটা চাপা দিয়ে বললাম-“ব্যাপার না সেটা।হাসা খুব ভালো। আজকাল সবাই তা পারে না।”

সানুঃ”বাহ, চমৎকার!ওহ তুমার নামইতো জানা হলো না।”

“শিরিন প্রীতিলতা কথা।”

সানুঃ “তো আমি কি ডাকবো?”

“তোমার যেটা খুশি।”

সানুঃ “অপশন দিয়ে দিলে?”

“হুম দিলাম। যা খুশি ডাকতে পারো।”

সানুঃ “বদ্ধ পাগলদের কখনোই অপশন দিতে নেই।কারন তাদের পাগলামিরও কোনো সীমা নাই।”

“কোনো ব্যাপার না।”

সানুঃ “ভালো।খুবই ভালো।তাহলে তোমাকে আমি লতা বলেই ডাকবো।”

হো হো হো করে আবার হাসি শুরু তার।রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিলো।কিন্তু অসম্ভব লেভের পাগলদের ওপর রাগা যায় না এটা একটা সীমাবদ্ধতা। আমাকেউ তা মানতে হবে।

“তা আমি তোমাকে কি ডাকবো?”

সানুঃ “এই যায়গায় সমস্যাটা। তোমাকে যে আমি কোনো অপশন দিতে পারছি না।কারন আমার ভালো নাম, খারাপ নাম দুটোই সানু।”

“ওহ”

সানুঃ “আমি বুঝতে পারছি তোমার সূক্ষ্ম একটা ক্ষোভ কাজ করছে তবে ব্যাপার না। তুমি আমাকে পাগলা সানু বলেও ডাকতে পারো।”

“আরে ধুর, কি যে বলো।”

সানুঃ “ভদ্রতা খুব ভালো। তবে পাগলদের সামনে ভদ্রতা দেখাবার প্রয়োজন নেই।আর তুমি আমায় পাগলা সানু না ডাকলেও কিন্তু আমি তোমায় লতা ডাকবো।”

“তুমি রাগ করবে না আমি তোমায় পাগলা সানু ডাকলে?”

সানুঃ “আমি কখনোই রাগ করি না।আমার চোখে যে চশমাটা দেখছো তা আমার মা আমায় ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় ১২০ টাকা দিয়ে কিনে দিয়েছিলেন।বলেছিলেন তা যেন কখনোই নষ্ট না করি।তাই আমি কখনোই এই চশমাটা ঝাপসা হতে দেই নি।তুমি গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে দেখবে যে, তুমি কারো সাথে রাগ করলে সে তোমায় এক দুদিন রিকুয়েস্ট করবে। তোমায় গুরুত্ব দিবে।এরপর আর পাত্তাই দিবে না তোমায় এটাই বাস্তবতা।সবাইকেই তা মানতে হবে।সো কি দরকার অহেতুক একজনের সাথে রাগ করে সুন্দর সময়টাকে নষ্ট করার?তোমার রাগ করাতে তো আর তার কিছু যাবে আসবে না।তাই আমি অলয়েজ হাসি।হাসবে আমার মতো করে হো হো হো হো,,,,,,,”

হাসতে হাসতে আমার কান্না চলে আসলো আমার এই পাগলটার যুক্তি দেখে।

ক্লাসে স্যার জীব বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন।সবাই মন দিয়ে শুনছে। শুধু পাগলা সানু মন দিয়ে ঘুমুচ্ছে।স্যার পড়াতে পড়াতে ওর কাছে এসে থামলেন।সবাই হাসছে।স্যার থামালেন সবাইকে।

স্যারঃ “আহা,ঘুমোক বেচারা। সারাদিন কত্তরকমের পাগলামি করতে হয়। কত্ত হাসিই না তাকে হাসতে হয়।হো হো হো,,,”

আবার সবাই হাসছে শুধু সানু বিভোর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে।বদ্ধ পাগল মানুষগুলা বোধহয় এমন সুন্দর করে ঘুমুতে পারে!বেশি পাগল মানুষগুলা ঘুমালে বেশি ভদ্র হয়ে যায়!স্যার ইভোলিউশন পড়াচ্ছেন।আর আমি মহা শান্তির ঘুম দেখছি।আর মনে মনে বলছি ইস,আমি যদি এত্ত সুন্দর করে ঘুমোতে পারতাম!

কলেজ ছুটির পর বিকেলে দেখি সানু বাচ্চাদের সাথে বালি মাখামাখি করছে। এখন আমার পুরো পুরি বিশ্বাস হচ্ছে ও যে বদ্ধ পাগল!

ওর সাথে ভালোই বন্ধুত্ব হয়েছে। না,ভালো বললে ঠিক ভুল হবে মোটামুটি ভালোই কম খারাপ না। হো হো হো,,,,,সানুর মতো করেই বললাম। তাকে তাই শুক্রবার বিকেলে বাসায় আসতে বললাম।কিন্তু ও আসবে না। তাই বললাম যে আমি অনেক ভালো চা বানাই। চায়ের প্রতি ওর সেই লেভের দুর্বলতা তাই অবশ্যই আসবে সে।আর আমি আগেই মা কে সব বলে রেখেছিলাম যে আমার একটা পাগলা কিসিমের বন্ধু আছে। সে আসবে কাল বিকেলে। মা যা যা জানতে চাইলো সব বললাম। মা আমায় নিয়ে চিন্তিত থাকতেন আমার কোনো বন্ধু ছিল না। যাক এবার মার ভালো লাগছে এই ভেবে যে আমার একটা বন্ধু আছে। বিকেল তো দূরে থাক ২ টা বাজতে না বাজতেই সানু এসে হাজির তাও শুক্রবারে।

“কিরে তুই নামাজ পড়িস না?”

সানুঃ “পড়ি তো।”

“তাইলে এত তাড়াতাড়ি আসলি যে নামাজ তো মনে হয় পড়িস নি।”

সানুঃ”আরে পড়ছি তো।আমি নামাজ পড়ে খুব দ্রুত চলে আসি। একটুও লেট করি না।এটা আমার ফিলোসোফি,, হো হো হো,,,,”

“কিন্তু কেনো?” প্রশ্নটা করলাম কারন আমি জানতাম যে ও কোনো হাস্যকর উত্তর দিবে। ঠিক তাই দিলো সে।

সানুঃ “একবার শুক্রবারে নামাজ পড়ে বাইরে এসে দেখি আমার জুতা নাই কে যেনো নিয়ে গেছে। এই চমৎকার ঘটনার তো আর পুনরাবৃত্তি করা যায় না।তাই এরপর থেকে আমি খুব দ্রুত নামাজ পড়ে বেড়িয়ে যাই।”

মা আর আমি দুজনেই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছি ওর কথা শুনে।

মা ওকে বললেন -“তোমার ভালো নাম কি বাবা সানু?”

সানুঃ “আন্টি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে আমার ভালো,খারাপ নাম দুটোই সানু।”

“সমস্যা নাই বাবা, খুব সুন্দর নাম তোমার।”

সানুঃ “আন্টি, লতার নাম ও কিন্তু অনেক সুন্দর। কে রেখেছে আপনি নাকি আংকেল?”

“লতা কে বাবা?”

আমি হাসতে হাসতে পাশের ঘর থেকে বললাম আমি মা।

মা এবার হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছেন।মাকে ভালোই সঙ্গ দিচ্ছে সানু।

“আচ্ছা বাবা তোমার নাকি কোনো কিছুতেই কোনো উইকন্যাস নাই?”

সানুঃ “আন্টি, এই পৃথিবীতে খুব অসম্ভব রকমের ভালো মানুষগুলার অসম্ভব লেভের কিছু উইকন্যাস থাকে। এই হিসেবে আমার কোনো উইকন্যাস থাকার কথাও না।”

“ওহ”

সানুঃ “তবে আন্টি কোনো কিছুতে আমার উইকন্যাস না থাকলেও চায়ের ব্যাপারে আমার ভালোই উইকন্যাস আছে।ভাবলাম একটা উইকন্যাস এর কথা না বললে আবার আপনি আমায় বেশি খারাপ মনে করবেন।হো হো হো হো,,,,,”

মার সাথে দেখলাম বেশ ভালোই গল্প জমিয়ে দিয়েছে সে।চা দিলাম ওর হাতে। ও চায়ে মুখ না দিয়েই বলল যে চা টা নাকি এত ভালো হয় নি।

আমি একটু রেগে বললাম -“না খেয়ে বললে কি করে?”

সানুঃ “চায়ের কালার দেখে।যদিও বিজ্ঞরা বলেন      “ডন্ট যাজ এ বুক বাই ইটস কাভার”কিন্তু তা আমি মানি না।দেখতেই যদি ভালো না লাগে তাহলে খেতে কেমনে ভালো লাগবে বলেন আন্টি,,, হো হো হো,,,”

অবশেষে চা টা খেলো সে।

সানুঃ “আন্টি, বিজ্ঞদের কথা মনে হয় পুরোপুরি ভুল না,, হো হো হো,,,,,,”

এবার মাও হাসছেন।

“আচ্ছা বাবা তোমার অনুমান শক্তি নাকি খুব ভালো?”

সানুঃ”ভালো কিনা জানি না। তবে আমার কাছে খারাপ মনে হয় না।”

“তাহলে বলোতো আমি কি করি?”

সানুঃ “খুব সম্ভবত আপনি গৃহিনী।”

“আসলেই তো দেখছি তোমার অনুমান শক্তি ভালো।”

সানুঃ “এটি বলার জন্যে অনুমান শক্তি অত ভালো হওয়ার দরকার নাই।”

“তাহলে কিভাবে বললে?”

সানুঃ “আপনি যদি কোনো জব করতেব তাহলে আমার কথা এত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন না। একমাত্র হাউসহুল্ডারাই পাগলদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে।”

মা যেন যত ওর কথা শুনছেন ততই মুগ্ধ হচ্ছেন।

“আমার সাথে কথা বলে কি বাবা তোমার ভালো লাগছে?”

সানুঃ “আমার সবার সাথে কথা বলেই ভালো লাগে।তবে সবার আমার সাথে কথা বলে ভালো লাগে না।তবে তাতে আমার কিছুই আসে যায় না।লতা আমায় কি আরো এক কাপ চা দিবে?”

আমি কিছুটা রেগে বললাম -“কিরে চা না ভালো হয় নি তাইলে আরেক কাপ খাবি?”

সানুঃ “কি করবো আমি যে চায়ের প্রতি যে অসম্ভব লেভের উইক।এজন্য উইকন্যাস খুব খারাপ জিনিস বুঝলেন আন্টি,,, হো হো হো হো হো”

মা যেন এখন আর হাসতে পারছেন না। থাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে ওর চশমার দিকে। যেন কোনো বাষ্পের আভাশই নাই। থাকার কথাও না তবে কেনো জানি মা তাকিয়ে  আছেন তা আমার জানা নেই।

অবশেষে ভদ্রতার জাত গুষ্টি উদ্ধার করে ছয় কাপ চা খেয়ে সে উঠলো।

পথের ধারে হয়তো ধুলো উড়াতে উড়াতে সানু হাসতে হাসতে হাটছে।

Like us on Facebook Page

Join us on Facebook Group

Contact us on web

Subscribe now to get newsletter

    মন্তব্য করুন

    Translate »
    %d bloggers like this: